মারিও পুজোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য গডফাদার’ এর শুরুটাই হয়েছে ক্যাঙ্গারু কোর্টের একটা ক্লাসিক বর্ণনা দিয়ে।

আমেরিগো বোনাসেরার তরুণী কন্যাকে ধর্ষণ করেতে গিয়েছিলো দুই তরুণ। মেয়েটা বাধা দেওয়া পৈশাচিকভাবে তাকে পেটায় তারা। এতে করে মেয়েটার চোয়াল ভেঙে যায়। সেই কেসের রায়ের দিন নিউ ইয়র্কের তিন নম্বর ক্রিমিনাল কোর্টে ন্যায় বিচারের আশায় বসে ছিলো।

বিচারক খুব ভয়ংকর মুখভঙ্গি করে বসে ছিলেন। রায় ঘোষণার আগে আস্তিন গুটিয়ে নিলেন। ভাবটা এমন যেনো অপরাধী দুই তরুণকে ধরে নিজেই পেটাবেন। ঘৃণায় তাঁর মুখটা থমথম করছে। এই পরিস্থিতিতেও বোনাসেরা টের পাচ্ছিলো যে কোথাও কোনো একটা ঘাপলা আছে। যদিও ঠিক বুঝতে পারছিলো না। রায় শোনার পরে বোনাসেরা অবশ্য বুঝে যায় ঘাপলাটা কোথায়।

রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারক কর্কশভাবে বললেন, “তোমরা নরাধমের মতো কাজ করেছো। জঙ্গলের বুনো জন্তুর আচরণ করেছো তোমরা। তবে, তোমাদের ভাগ্য ভালো যে তোমরা মেয়েটার সতীত্ব নষ্ট করতে পারো না। সেটা করলে তোমাদের আমি বিশ বছরের জেল দিতাম। কিন্তু, তোমরা যেহেতু অভিজাত পরিবারের সন্তান, তোমাদের বয়স কম আর আইন প্রতিশোধে বিশ্বাসী নয় বলে তোমাদের তিন বছরের কারাদণ্ড দিলাম। এই দণ্ড মওকুফ থাকবে।“

রায় ঘোষণার পরে আমেরিগো বোনাসেরা বুঝেছিলো যে ওটা কোনো বিচার হয়নি, বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে।

এই রকম একটা প্রহসনের বিচার বা ক্যাঙ্গারু কোর্ট অতি সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশেও দেখলাম। তবে, মারিও পুজো ক্যাঙ্গারু কোর্টের যে ক্লাসিক বর্ণনা এঁকেছেন তাঁর বইয়ের প্রথম পাতাতে, সেই ক্লাসি ফ্লেভার এখানে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত ছিলো। তার বদলে খুবই সস্তা এবং স্থূল ধরনের একটা ক্যাঙ্গারু কোর্ট হয়েছে বাংলাদেশে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা-বিরোধী অপরাধের জন্য শেখ হাসিনার বিচার হচ্ছিলো। ওই ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রায় সবাই ছিলো জামাতের লোক। এমনকি শেখ হাসিনার পক্ষে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন, তিনিও খুব সম্ভবত জামাতি। শেখ হাসিনা যেহেতু আদালতে অনুপস্থিত রয়েছেন, ফলে তিনি কোনো আইনজীবীকে নিয়োগ দেন নাই তাঁর পক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ করার জন্য। সে কারণে, ট্রাইব্যুনাল নিজেই একজনকে নিয়োগ দিয়েছে। জেড আই খান পান্না বলেছিলেন, তিনি শেখ হাসিনার পক্ষে লড়বেন। কিন্তু, তাঁকে সেই সুযোগ দেওয়া হয় না। ট্রাইব্যুনাল বলে দিয়েছে, আইনজীবী নিয়োগ হয়ে গিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিয়োজিত সেই আইনজীবীর নাম আমির হোসেন।

কিছুদিন আগে এই ভদ্রলোকের সাথে ট্রাইব্যুনালের একটা কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। সেখানে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বলছে, আপনি কেনো শেখ হাসিনার মুক্তি চান গণ মাধ্যমের কাছে? তিনি তখন খুব লাজুক হাসি মুখে মেখে বলছেন, আমি তাঁর ডিফেন্স লইয়ার, আমি যদি তাঁর মুক্তি না চাই, তাহলে তো লোকে বুঝে যাবে যে আমি তাঁর মুক্তি চাচ্ছি না।

এই ভদ্রলোক যে আন্তরিকভাবে তাঁর মক্কেলের জন্য কাজ করবেন না, সেটা বলাই বাহুল্য। তাঁকে মূলত রাখাই হয়েছে আসামীপক্ষের আইনজীবী হিসাবে অভিনয় করার জন্য। তবে, সেই অভিনয়টা তিনি খুব কাঁচাভাবে করেছেন। রায় শুনে তিনি কষ্ট পেয়েছেন, এটা বলেছেন মিডিয়াকে। কিন্তু সবাই দেখেছে তিনি উচ্ছ্বসিত আনন্দের হাসি চেপে রাখতে পারছিলেন না। পৃথিবীতে তিনিই খুব সম্ভবত একমাত্র ডিফেন্স লইয়ার যিনি তাঁর মক্কেলের ফাঁসি হওয়াতে আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন, বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসেছেন। একই সাথে বিচার স্বচ্ছ হয়েছে বলে দাবি করেছেন। অথচ, তাঁর নিজের আচরণ এবং কর্মকাণ্ডই স্বচ্ছ ছিলো না। বাকিদের কথা না হয় নাই বা বললাম।

ফরিদ আহমেদ